সাধারণ জ্ঞান • Literature, arts and culture • Dhaka Board • ঢাকা বোর্ড ২০১৯
সাধারণ জ্ঞান প্রশ্ন
যেকোনো একটি বিষয়ে প্রবন্ধ লেখো:
11.1.
একুশ বাঙালির অহংকার
11.2.
মাদকাসক্তির কারণ ও প্রতিকার
11.3.
বৃত্তিমূলক শিক্ষা
11.4.
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
11.5.
বিদ্যুৎ ও আধুনিক জীবন
উত্তর ও ব্যাখ্যা
AI-তৈরি নমুনা উত্তর
একুশ বাঙালির অহংকার
ভূমিকা:
বাঙালির জাতীয় জীবনের ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি এক অনন্য, উজ্জ্বল ও চিরভাস্বর অধ্যায়। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল ছাত্র-জনতার বুকের রক্তে। একুশ শুধু মাতৃভাষার দাবি আদায়ের দিন নয়; একুশ বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধিকার চেতনা এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূল উৎস। তাই একুশ বাঙালির আত্মমর্যাদা ও চিরন্তন অহংকার।
ঐতিহাসিক পটভূমি:
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভৌগোলিক দূরত্ব এবং সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য সত্ত্বেও পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর শোষণ ও দমননীতি চালাতে শুরু করে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় ঘোষণা করেন—"Urdu, and only Urdu shall be the state language of Pakistan." এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে এবং মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদার লড়াই শুরু হয়।
১৯৫২-এর রক্তঝরা একুশে ফেব্রুয়ারি:
১৯৫২ সালের শুরুতেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ সর্বদলীয়ভাবে তীব্র আন্দোলনের ডাক দেয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশনের দিনে প্রদেশজুড়ে ধর্মঘট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কিন্তু সাহসী ছাত্রসমাজ অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। পুলিশের বুলেটে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না-জানা অনেকে। রক্তের বিনিময়ে বাঙালি ছিনিয়ে আনে মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি।
জাতীয় জীবনে একুশের প্রভাব:
ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী বিজয় বাঙালির মনে এই বিশ্বাস তৈরি করে যে ন্যায্য দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। একুশের রক্তস্নাত পথ ধরেই বাঙালি এগিয়ে যায় চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের দিকে। অবশেষে অর্জিত হয় একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাই একুশই আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি:
বাঙালির ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা গৌরবময় ইতিহাস ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো কর্তৃক বৈশ্বিক স্বীকৃতি লাভ করে। ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের প্রতিটি দেশ নিজ নিজ মাতৃভাষাকে সংরক্ষণ ও মর্যাদাদানের অঙ্গীকার নিয়ে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করছে। একটি জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাস আজ বিশ্বমানবের সম্পদে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের জন্য চরম অহংকারের বিষয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়:
একুশ আমাদের যেমন গর্বিত করে, তেমনি একুশ আমাদের দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বাংলা ভাষার বিকৃতি ও অবক্ষয় রোধ করা জরুরি। সাইনবোর্ড, দাপ্তরিক কাজ এবং উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার যথার্থ প্রচলন নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলোকেও সংরক্ষণ ও লালন করতে হবে।
উপসংহার:
একুশ কেবল শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ কিংবা প্রভাতফেরির গানে সীমাবদ্ধ নয়; একুশ বাঙালির চিরকালীন দ্রোহ, জাগরণ ও পথচলার বাতিঘর। যতদিন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বহমান থাকবে, ততদিন বাঙালি হৃদয়ে একুশ বেঁচে থাকবে সাহসের প্রতীক ও জাতীয় অহংকার হয়ে।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও