হিন্দু ধর্ম • অবতার ও আদর্শ জীবনচরিত • Combined Board • সকল বোর্ড ২০১৮
হিন্দু ধর্ম প্রশ্ন
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানমনস্ক সুধীজন সনাতন তথা হিন্দুধর্মের প্রচলিত পূজা-পার্বন, ধ্যান-ধারণা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। এক্ষেত্রে ভারতবর্ষের একজন যুক্তিবাদী সংস্কারকের উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ব্রহ্মের উপাসনার তত্ত্বকে উপস্থাপন করেন। ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে তিনি এক ব্রহ্মের সাধনার জন্য আহ্বান জানান। তিনি ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
- ক)(1)
শ্রী বিজয়কৃষ্ণ কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
- খ)(2)
শ্রী বিজয়কৃষ্ণের মতে পৈতা বর্জন করা উচিত কেন? ব্যাখ্যা করো।
- গ)(3)
ঈশ্বরের লীলা দর্শনে শ্রী বিজয়কৃষ্ণ যে অহিংস হৃদয়ের কথা বলেছেন তার শিক্ষা তোমার জীবনে কীভাবে প্রতিফলন ঘটবে? ব্যাখ্যা করো।
- ঘ)(4)
উক্ত মতবাদটির সাথে বহু দেব-দেবী ও এক ঈশ্বর সম্পর্কিত মতবাদের যে সমন্বয় হয়েছিল উদ্দীপকের আলোকে বিশ্লেষণ করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা
- ক)
শ্রী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বাংলা ১২৪৮ সালে (১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন।
- খ)
বিজয়কৃষ্ণের মতে পৈতা জাতিভেদের চিহ্ন। তিনি কলকাতার মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় 'হিতসঞ্চারিণী' সভায় বলেন, পৈতা জাতিভেদের চিহ্ন, তাই তা ত্যাগ করা উচিত। তিনি মানুষে মানুষে বর্ণভেদ বা বিভেদ চাননি। এ কথা শুনে ব্রাহ্মণ বন্ধুরা সবাই পৈতা ফেলে দেন। সে সময় ব্রাহ্মণ হয়ে পৈতা ত্যাগ ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ।
- গ)
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী উপদেশ দিয়েছেন, অন্তরে হিংসা থাকলে ঈশ্বরের লীলা দর্শন হয় না। কিছু সময়ের জন্যও হৃদয় হিংসাশূন্য হলে লীলা দর্শন হতে পারে। তিনি আরও বলেছেন, কখনো পরনিন্দা করবে না এবং সর্বজীবে দয়া করবে। এই অহিংস হৃদয়ের শিক্ষা আমার জীবনে নিম্নভাবে প্রতিফলিত হবে।
উপনিষদের শিক্ষা অনুযায়ীও জীবে আত্মারূপে ব্রহ্ম বাস করেন, তাই কাউকে হিংসা করা মানে নিজেকেই হিংসা করা। সুতরাং:
১. আমি সহপাঠী, প্রতিবেশী ও পরিবারের সবার প্রতি হিংসা, ঈর্ষা ও রাগ পরিহার করব এবং সবার সঙ্গে সদ্ভাব রাখব।
২. কারও নিন্দা করব না, কটু কথা বলব না এবং সত্য কথা বলব।
৩. পশুপাখিসহ সকল জীবের প্রতি দয়া দেখাব এবং অসহায়কে সাহায্য করব।
৪. অহংকার ত্যাগ করে ঈশ্বরের নাম স্মরণ করব ও নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মপথে চলব।এভাবে আমার হৃদয় হিংসামুক্ত ও পবিত্র হবে এবং আমি সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারব।
- ঘ)
উদ্দীপকের মতবাদটি ব্রাহ্মসমাজের একেশ্বরবাদী মতবাদ, যার প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায়। এর সঙ্গে বহু দেব-দেবী ও এক ঈশ্বর সম্পর্কিত মতবাদের সমন্বয় ঘটেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশের মাধ্যমে।
ঊনবিংশ শতকে রামমোহন রায় লক্ষ করেন, বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসক হয়ে হিন্দু সম্প্রদায় ক্ষুদ্র গোষ্ঠীচিন্তায় সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। সব উপাস্য যে একই ব্রহ্মের বিভিন্ন প্রকাশ, তা তারা ভুলতে বসেছে। তাই তিনি এক ব্রহ্মের উপাসনার তত্ত্ব তুলে ধরে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করেন। তাঁর মতে ব্রহ্মই একমাত্র আরাধ্য।
১. ব্রাহ্মসমাজের সীমাবদ্ধতা: সুধীমহলে এই সংস্কার নন্দিত হলেও সাধারণ মানুষ তাদের প্রচলিত বিশ্বাস ও পূজা-পার্বণ ত্যাগ করতে পারেননি।
২. রামকৃষ্ণের সাকার সাধনা: মানুষের এই অনুভূতিতে শক্তি জোগায় শ্রীরামকৃষ্ণের সাকার মাতৃসাধনার সাফল্য।
৩. সমন্বয়ের বাণী: তাঁর অমর উপদেশ 'যত মত, তত পথ' এবং 'যত্র জীব, তত্র শিব' একেশ্বরবাদী ধারণা ও বহু দেব-দেবীরূপে ঈশ্বর আরাধনা, এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটায়। তিনি দেখিয়েছেন, বিভিন্ন দেব-দেবী ও মতপথ একই ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যায়।
৪. প্রতিষ্ঠানিক রূপ: এই ভাবাদর্শ প্রচারে ১৮৮৬ সালে রামকৃষ্ণ মঠ এবং ১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বিবেকানন্দের বাণী 'বিবাদ নয়, সহায়তা; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি'।সুতরাং, ব্রাহ্মসমাজের এক ব্রহ্মের উপাসনা এবং সাধারণ মানুষের বহু দেব-দেবীর উপাসনা, এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের 'যত মত, তত পথ' উপদেশের মাধ্যমে।
আরও প্রশ্ন অনুশীলন করতে অ্যাপে যাও